আজ কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, ঘরে ঘরে ধনদেবীর আরাধনা

📝 নিজস্ব সংবাদদাতা, Todays Story:বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে ধন-সম্পদ, সুখ ও সমৃদ্ধির দেবী মা লক্ষ্মীর আরাধনার মহাপর্ব হলো কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। শারদীয়া দুর্গোৎসবের শেষে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের এই পূর্ণিমা তিথিটি ‘শারদ পূর্ণিমা’ বা ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ নামে পরিচিত।
২০২৬ সালের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আজ অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর, রবিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের পুজোর নির্ঘণ্ট ও শুভ সময়

বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ও গুপ্তপ্রেস— উভয় পঞ্জিকা মতেই পূর্ণিমা তিথি ২৫ অক্টোবর (রবিবার) দুপুরের আগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে এবং থাকবে ২৬ অক্টোবর (সোমবার) সকাল পর্যন্ত। যেহেতু কোজাগরী ব্রতের প্রধান নিয়ম হলো রাতে পূর্ণিমা তিথি থাকা, তাই ২৫ অক্টোবর রবিবার রাতেই পুজো ও জাগরণ সম্পন্ন করার প্রধান বিধান।

  • পূর্ণিমা তিথি শুরু: ২৫ অক্টোবর, রবিবার সকাল ১০টা ৫৭ মিনিট (গুপ্তপ্রেস) / সকাল ১১টা ৫৮ মিনিট (বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত)।
  • পূর্ণিমা তিথি শেষ: ২৬ অক্টোবর, সোমবার সকাল ৯টা ৪৮ মিনিট (গুপ্তপ্রেস) / সকাল ৯টা ৪১ মিনিট (বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত)।
  • নিশীথ পুজো ও অমৃতযোগ (কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা): ২৫ অক্টোবর রাতে প্রধান পুজোর প্রকৃষ্ট সময় প্রদোষকাল থেকে মধ্যরাতের (নিশীথ কাল) মধ্যে। দ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী নিশীথ পুজোর বিশেষ সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত।

‘কোজাগরী’ শব্দের তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য

‘কোজাগরী’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ বাক্যাংশ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছো?’।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী স্বর্গ থেকে মর্ত্যলোকে নেমে আসেন এবং ঘরে ঘরে পরিভ্রমণ করে দেখেন কে জেগে আছেন। যারা এই রাতে জেগে দেবীর আরাধনা করেন এবং অক্ষক্রীড়া (পাশা খেলা) বা ভজন-কীর্তন করেন, দেবী তাদের ঘর ধন-ধান্যে ও ঐশ্বর্যে ভরিয়ে দেন। কথিত আছে— “যার কিছু নেই সে পাওয়ার আশায় জাগে, আর যার আছে সে না হারানোর আশায় জাগে”।

পুজোর প্রধান আচার ও লোকরীতি

বাঙালি সংস্কৃতিতে এই পুজোর আচার অত্যন্ত নান্দনিক এবং এটি মূলত পরিবারের মহিলারাই ভক্তিভরে সম্পন্ন করে থাকেন।

  • চালের গুঁড়োর আলপনা: লক্ষ্মীপুজোর প্রধান অঙ্গ হলো খড়িমাটি বা চালের গুঁড়োর পিটুলি দিয়ে আঁকা আলপনা। বাড়ির প্রবেশদ্বার থেকে পুজোর আসন পর্যন্ত মা লক্ষ্মীর ছোট ছোট পায়ের ছাপ, ধানের ছড়া এবং পদ্মফুলের মোটিফ আঁকা হয়।
  • পুজোর মাধ্যম: অনেকে প্রতিমার পুজো করেন, আবার বহু পরিবারে মাটির সরা (লক্ষ্মীর সরা), ধান ভর্তি কলার বের (আড়ি লক্ষ্মী), থোড়ের তৈরি সপ্ততরী (নৌকো) কিংবা ঘট স্থাপন করে পুজো করার প্রাচীন রীতি রয়েছে।
  • লক্ষ্মীর পাঁচালি: পুজোর শেষে পরিবারের সকলে মিলে হাতজোড় করে ‘লক্ষ্মীর ব্রতকথা’ বা পাঁচালি পাঠ শোনেন এবং দেবীর আরতি করেন।

ভোগ ও প্রসাদের বৈচিত্র্য

ঘটি এবং বাঙাল (পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ববঙ্গীয় মূলের পরিবার) ভেদে লক্ষ্মীপুজোর ভোগের মধ্যে চমৎকার বৈচিত্র্য দেখা যায়:

জোড়া ইলিশের বিশেষ রীতি: পূর্ববঙ্গীয় (বাঙাল) পরিবারগুলোর অনেকের বাড়িতেই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয় দেবীকে ‘জোড়া ইলিশ’ ভোগ দেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে। এটি মূলত উর্বরতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক। সম্পূর্ণ তেল-মশলা ছাড়া অত্যন্ত সামান্য উপকরণ দিয়ে কাঁচা মাছের পাতলা ঝোল রান্না করে দেবীর সামনে নিবেদন করা হয়।

সাধারণ নিরামিষ ভোগ: গোবিন্দভোগ চালের খিচুড়ি, লাবড়া (পাঁচমিশেলি সবজি), লুচি, সুজি, পায়েস, এবং হরেক রকমের মিষ্টি ও ফল।

নাড়ু ও মোয়া: তিলের নাড়ু, নারকেলের নাড়ু, খই ও চিড়ের মোয়া এবং বাতাসা এই পুজোর অপরিহার্য উপাদান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *