📝শুভদীপ রায় চৌধুরী, Todays Story: শারদোৎসবের বাকি আর কয়েকটি দিন। বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে প্রতিমা নির্মাণের কাজ। তবে বাংলার বেশ কয়েকটি মন্দিরে বছরের পর বছর ধরে সুপ্রাচীন চণ্ডী বিগ্রহেই দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তেমনই এক পরিবার শেওড়াফুলি রাজ পরিবার। এ বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক ইতিহাস। সূত্র মারফত জানা যায়, বর্ধমানের পাটুলির নারায়নপুরে রাজত্ব ছিল দত্তদের। সেই রাজত্বে বিগ্রহের সমাহার দেখে সম্রাট আকবর অনেক জমি দান করেন। সেই জমি আর রাজবাড়ির অংশ চলে যায় গঙ্গার গ্রাসে। তারপরেই শেওড়াফুলিতে পরিবার নিয়ে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন মনোহর দত্ত রায়। শেওড়াফুলি ছিল তাদের কাছারি বাড়ি। বর্ধমানের আটিসারা গ্রামে পুকুর খননের সময় স্বপ্নাদেশ পান মনোহর রায়। আর অষ্টধাতুর সেই দশভুজা বিগ্রহ শেওড়াফুলির নাট মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন সর্বমঙ্গলা রূপে। অষ্টধাতুর সেই প্রাচীন মূর্তি নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হয়ে আসছে শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে। সারাবছর নিত্য পুজো হয় দুবেলা। তবে দুর্গাপুজোর চারদিন হয় বিশেষ পুজো পাঠ।
প্রতিবছরই হুগলির এই শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে সাড়ম্বরে দূর্গা পুজো অনুষ্ঠিত হয়। পঞ্জিকা অনুযায়ী, এ বাড়ির পুজো দুর্গা ষষ্ঠীর ১৫ দিন আগে থেকেই শুরু হয়। দেবী দুর্গা এখানে পূজিত হন সর্বমঙ্গলা রূপে। বলাবাহুল্য, রাজবাড়ির দুর্গা প্রতিমা অষ্টধাতুর। দুর্গার চারপাশে কার্তিক গণেশ লক্ষ্মী সরস্বতী কেউই নেই। তবে দুর্গার পায়ের নীচে রয়েছেন অষুর এবং বাহন ঘোটকাকৃতি সিংহ।
উল্লেখ্য, রাজা মনোহর রায় স্বপ্নাদেশ পান দেবী সর্বমঙ্গলা মাটির ভেতর কষ্ট পাচ্ছিলেন। তাই তাঁকে যেন সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। স্বপ্নাদেশে তিনি জানতে পারেন বর্ধমানের আটিসারা গ্রামেই তিনি রয়েছেন। সেই মতো রাজা লোক পাঠিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করে দেখতে পান সেই অষ্টধাতুর মূর্তি। পরে সেটিকে নিয়ে এসে শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে দুর্গা রূপে পূজা করা হয়। কৃষ্ণানবমী তিথিতে শেওড়াফুলি রাজবাড়ি দুর্গাপুজো শুরু হয়। অষ্টধাতুর দেবী দুর্গার মূর্তি নিত্য সেবা হয় প্রতিদিন। এই দিন থেকেই পরিবারের সমস্ত সদস্যরা মেতে ওঠেন দুর্গাপূজার আনন্দে। কুড়ি দিন ধরে পুজোর উৎসবের আনন্দে মেতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। পুজোর শুরুর দিনে প্রাচীন প্রথা মেনেই মধ্যাহ্ন ভোজের পাত পাড়া হয়। মেনুতে থাকে ইলিশ মাছ, পরোটা এবং ছাঁচি কুমড়ার তরকারি।
প্রসঙ্গত, এই মন্দিরে লক্ষ্মী-জনার্দন ছাড়াও গোবিন্দহরি ও রাধিকা এবং বটকৃষ্ণ নারায়ণ শিলাও নিত্য পূজিত হয়। এর পাশাপাশি, বংশ পরম্পরায় দুর্গোৎসব হয়ে আসছে, এটিও এক বৈশিষ্ট্য। বাসুদেব রায়ের বংশধর গিরীন্দ্র চন্দ্র রায়ের একমাত্র কন্যা হলেন নিরুপমা দেবী। তিনি এই রাজবংশের পুজোকে নিয়ে এক সিদ্ধান্ত নেন। ভাগলপুরের চম্পানগরবাসী রাজবংশীয় ঘোষ পরিবার বিবাহ সূত্রে এই বংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায়, তিনিই এই পরিবারের হয়ে পুজো এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলেই জানান। আর সেই কারণেই এক বছর রায় পরিবার এবং অন্য বছর ঘোষ পরিবার পালা করে এই রাজবাটীতে দুর্গোৎসব পালন করেন।

