📝 নিজস্ব সংবাদদাতা, Todays Story: ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় উর্দু আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাঙালি যুবকদের জীবনদানের স্মরণে আজকের দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে পালিত হয়। মাতৃভাষার অধিকার বঞ্চিত যেকোন জাতির কাছেই আজকের দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে হিন্দি আগ্রাসনের চাপে প্রতিনিয়ত কোণঠাসা হতে থাকা অহিন্দিভাষী জাতিগুলির কাছেও একুশে ফেব্রুয়ারি এক অনুপ্রেরণার নাম। ভারতীয় বাঙালির কাছে এইদিন তো বিশেষ ভাবেই তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সরকার থেকে বিভিন্ন সংগঠন আজকের দিনে ভাষা শহীদদের স্মরণে নানান অনুষ্ঠান করে থাকে। সারা বছর বাংলা ভাষা তথা বাঙালির অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে আসা সংগঠন বাংলা পক্ষ, এই দিনটি পালন করলো একটু অন্য ভাবে।
এই সপ্তাহ জুড়ে ‘বাংলা ভাষার অধিকার সপ্তাহ’ পালন করলো বাংলা পক্ষ। বাংলা ভাষাকে কাজের ভাষা করে তুলতে রাজ্য, কেন্দ্র সরকারি নানা অফিস থেকে বেসরকারি ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার দাবিতে সপ্তাহব্যাপী একাধিক কর্মসূচী অনুষ্ঠিত হয়। বাংলার রাজ্য সরকারি চাকরিতে বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলকের দাবিতে PSC ভবন, স্কুল শিক্ষায় বাংলা বাধ্যতামূলকের দাবিতে শিক্ষাদপ্তরে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। কলকাতা কর্পোরেশন এলাকায় সাইনবোর্ডে বাংলা বাধ্যতামূলকের আইনের বাস্তবায়ন, রেলে সকল পরিষেবায় বাংলা ভাষা এবং বাংলা জানা কর্মী নিয়োগের দাবিতে পূর্ব রেলের সদরদপ্তর ও মেট্রো ভবনে ডেপুটেশন কর্মসূচী হয়। বাংলা পক্ষর সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি জানান “বাংলা ভাষার স্বার্থে এই ডেপুটেশন কর্মসূচীগুলি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এছাড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে পৌর ও নগরোন্নয়ন দপ্তর এবং পঞ্চায়েত দপ্তরের সচিবদের মেল করে রাজ্যের সব পৌরসভা ও পঞ্চায়েত এলাকায় পযিষেবা থেকে সাইনবোর্ডে বাংলা বাধ্যতামূলক করার এবং হকারি, অটো, টোটোর লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বাঙালিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি করা জানানো হয়েছে। উবের, ওলার মতো যাত্রী পরিষেবার সাথে যুক্ত সংস্থাগুলোতেও বাংলা ভাষায় পরিষেবা ও চালকদের বাংলা ভাষা জানা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়ে ইমেল করা হয়েছে।”
তিনি বলেন সার্বিক ভাবে বাংলার মাটিতে বাংলা ভাষাকে কাজের ভাষা করে তোলাই বাংলা পক্ষর লক্ষ্য। ব্যাঙ্ক পরিষেবায় বাংলা ভাষার দাবিতে করা জনস্বার্থ মামলায় হলফনামা দিয়ে বাংলায় পরিষেবার কথা বললেও বাস্তবে অনেক বাঙালি মাতৃভাষায় পরিষেবা পাচ্ছে না, এই বিষয়ে আগামীদিনে বৃহত্তর আন্দোলন ও আইনি লড়াইয়ের কথা শোনা গেল কৌশিক মাইতির কণ্ঠে। আজ কলকাতা জেলা বাংলা পক্ষর উদ্যোগে মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে বেলাঘাটায় উপস্থিত হয়ে তিনি এই কথা বলেন।
অন্যদিকে বাংলা পক্ষর সাধারণ সম্পাদক গর্গ চট্টোপাধ্যায় আজ বরানগরে ভাষাশহীদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন “আজকের দিন শুধু উদযাপনের নয়, আজকের দিন আমাদের নিজের মাটিতে নিজের মাতৃভাষার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার শপথ নেওয়ার দিন। বিগত এক সপ্তাহ ধরে বাংলা ভাষার অধিকার অর্জনের জন্য বাংলা পক্ষর কর্মসূচীগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আজও বাংলায় কথা বললে আক্রান্ত হচ্ছে, খুন হচ্ছে। মাতৃভাষায় কথা বলায় যারা যারা প্রাণ দিচ্ছে, তারা সকলেই ভাষা শহীদ। গত কয়ে ক’বছর যত জন বাঙালি বাংলা ভাষা বলায় খুন হয়েছেন, তাদের সকলকে ভাষা শহীদের মর্যাদা দিতে হবে।”
শুধু উদাযাপন নয়, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পালিত হল ভাষা দিবস। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলে ইস্কোর বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি বন্ধ করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আজ পথে নামে বাংলা পক্ষর সহযোদ্ধারা, হয় বিক্ষোভ ও ডেপুটেশন কর্মসূচী। শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে ভাষা শহীদ স্মারকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সংগঠনের সদস্যরা, উপস্থিত ছিলেন শীর্ষ পরিষদ সদস্য রজত ভট্টাচার্য। শিলিগুড়ির সমস্ত সাইনবোর্ডে বাংলা বাধ্যতামূলক করার আইন এখনও কার্যকর হয়নি কেন, শিলিগুড়ির পুরসভার উদ্দেশ্যে সেই প্রশ্ন ছোঁড়ে বাংলা পক্ষ। মালদায় বাংলা ভাষার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে এক মনোজ্ঞ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, নিউটাউন থেকে আসানসোল, বরাহনগর থেকে জলপাইগুড়ি, মুর্শিদাবাদ থেকে পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলী থেকে দাসপুর ও খড়গপুর, মালদা থেকে হাওড়া, খড়দা থেকে আলিপুরদুয়ার- সর্বত্র ভাষা দিবস পালন করলো বাংলা পক্ষ
পাহাড় থেকে মোহনা- প্রতিটা জেলায়, প্রতিটা প্রান্তে বাংলা পক্ষ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করলো। বাংলা শিল্পী পক্ষর উদ্যোগে নিউটাউনে বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা-গান- নৃত্যের মাধ্যমে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার বার্তা দেন বাঙালি শিল্পীরা।
এছাড়া সর্ব ভারতীয় প্রেক্ষিতে বিভিন্ন অহিন্দি সংগঠনের প্রতিনিধি হিসাবে বাংলা পক্ষ ও অন্যান্য অহিন্দি (কন্নড়, তামিল, পাঞ্জাবী, মালোয়ালি ইত্যাদি) সংগঠন হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ ভাবে শপথ নিল। অহিন্দি ভাষা ও জাতির লড়াইয়েও বাংলা পক্ষ অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে৷

